এম. মনছুর আলম, চকরিয়া :
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় দুই উপজেলার অন্তত ১৪টি ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সোমবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
এদিকে সোমবার সারাদিন থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাত এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার নিচু এলাকা এবং গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এতে দুই উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, এভাবে আরও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা টানা বৃষ্টিপাত হলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স কোম্পানির নির্মিত অপরিকল্পিত মাটির বাঁধের কারণে ফাঁসিয়াখালী ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের অন্তত সাতটি গ্রামের পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় কালভার্ট না থাকায় পানি জমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয় নারী-পুরুষদের নিজেদের বসতভিটা ও সহায়-সম্পদ রক্ষায় ওই মাটির বাঁধ অপসারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, সারাদিনের ভারী বর্ষণে দুই উপজেলার মানুষ বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পাহাড়বেষ্টিত এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় পাহাড়ের ঢাল, ঝুঁকিপূর্ণ টিলা, খাদ ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার সব স্লুইসগেট খুলে দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান কাইছার জানান, দুই দিনের টানা ভারী বর্ষণের কারণে সোমবার দুপুর থেকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়েছে। প্রবল স্রোতে তাঁর ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। রাতে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, তাঁর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর ও পহরচাঁদা এলাকার বিভিন্ন অংশ দিয়ে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। দুপুর থেকেই কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। রাতে নদীতে ঢলের প্রবাহ আরও বাড়লে নদীতীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাতভর বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেফাজতুর রহমান চৌধুরী টিপু বলেন, ভারী বর্ষণে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ নিচু এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে। এতে উপজেলার চিংড়ি চাষের হাজার হাজার প্রকল্প তলিয়ে গিয়ে ঘের মালিক ও চাষিদের কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীন দেলোয়ার বলেন, সোমবার সন্ধ্যা থেকে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তা বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। উপজেলার কোথাও নদীর পানির চাপে কোনো বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকার সব স্লুইসগেটের কপাট খুলে রাখা হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
